রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১ | ১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪২৮

অধ্যাপক মো. হাশেমের গান নিয়ে ভার্চুয়াল সেমিনার আজ

জাগরণ বার্তা ডেস্ক

নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় বাংলা গানের কালজয়ি রূপকার অধ্যাপক মো. হাশেম এর গীতি কবিতার সাহিত্যমূল্য নিয়ে অনলাইন সেমিনারের আয়োজন করেছে গবেষণা ধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ’। আজ সন্ধ্যা ৭টা. ১৫ মিনিটে ফেসবুকে এই সেমিনার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সেমিনারে প্রবন্ধপাঠ করবেন টিভি নাট্যকার ও নির্মাতা সাজ্জাদ রাহমান। প্রবন্ধের শিরোনাম ‘নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের মুকুটহীন সম্রাট: অধ্যাপক মো. হাশেম’।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড ডমিনিক ক্যাডেট, কন্ঠ, আবৃত্তি শিল্পী ও অভিনেতা জহির হক, কবি ও সংস্কৃতিজন মাহমুদুল হক ফয়েজ, কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মিন্টু সারেং এবং কবি ও গবেষক কাজী খসরু।

অধ্যাপক মো. হাশেমকে নিয়ে এটিই প্রথম অনলাইন সেমিনার। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ’ এর পক্ষ থেকে উপরোক্ত সেমিনারটি সকলকে উপভোগ করার লক্ষ্যে ইভেন্ট এর সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আহবান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নোয়াখালীর অধিবাসীসহ সব সমজদার সঙ্গীত স্রোতার উদ্দেশ্যে নিম্নে প্রবন্ধটি সংযুক্ত করা হলো।

লেখক, টিভি নাট্যকার ও নির্মতা সাজ্জাদ রাহমানের মূল প্রবন্ধ ‘নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের মুকুটহীন সম্রাট: অধ্যাপক মো. হাশেম’

বড় অসময়ে আমরা হারিয়েছি তাঁকে। করোনার করাল থাবায় পুরো দেশ যখন লন্ডভন্ড, সেই নিদানকালে কাউকে কিছু না বলে বুকে বড় অভিমান নিয়ে চুপটি করে চলে গেলেন কালজয়ী এই গীতিকবি। যেখানে তাঁর জানাজায় লাখো জনতার ঢল নামার কথা ছিলো।করোনার নিদানকালে সেরকম হয়নি সত্যি, তবুও সেদিন করোনার ভয় উপেক্ষা করে জেগে ছিলো পুরো মাইজদী শহর। জেলা শহরের রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো শত সহস্র মানুষ, চোখে মুখে অপেক্ষা কখন আসবে তাদের প্রাণপুরুষ। লাশবাহি এম্বুলেন্সটা আসার পর কিছু মানুষ পাগলের মতো গাড়ীর পেছনে পেছনে উন্মাদের মতো ছুটেছিলো।

মো. হাশেমের জন্য তাঁরা সত্যিই পাগল ছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের অন্তরের মুকুটহীন সম্রাট। কেননা তাঁর গানের কথা ও সুরে ঝংকৃত হয়েছিলো গণমানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত কথামালা।

অধ্যাপক মো: হাশেম একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী কালজয়ী গীতিকবি। তাঁর গান শুধু নোয়াখালীর নয়, গোটা দেশের তথা বৈশ্বিক সম্পদ। অধ্যাপক মো: হাশেম এর গান শুধু গান নয়, সেখানে একদিকে যেমন রয়েছে নোয়াখালী জেলার আদি এবং অকৃত্রিম ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস- তেমনি রয়েছে প্রান্তিক থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের নানান গল্প। তাদের ভাবনা, প্রবৃত্তি, আচার, উপলব্ধি, সীমাবদ্ধতা, প্রেম, বিরহ, মোহ, হতাশা শ্রাবণ ধারার অবিরত শব্দে এইসব গানে উঠে এসেছে।

একজন চিত্রকর যেমন ছবি আঁকেন, একজন গল্পকার যেমন গল্প লেখেন কিংবা নাট্যকার লেখেন নাটক, অধ্যাপক মো: হাশেম এর গানে আমরা ঠিক একই ধরণের দৃশ্যকল্প দেখতে পাই। তাঁর গান কখনও শিল্পীর পটে আঁকা ছবি, নাট্যকারের নাটক, কখনও জীবনমুখী গল্প। তাঁর গানে কখনও কখনও কিছু চরিত্র দেখতে পাওয়া যায়, সেই চরিত্রগুলোয় থাকে মানুষের জীবন যাপনের নানা দিক, পেশা, ভাবনা, তাদের যাপিত জীবনের আঘ্রাণ। একই সাথে পাই সৃষ্টিতত্ত্ব তথা আধ্যাত্ববাদ।’

মো: হাশেম তাঁর গানে যেভাবে বহুমাত্রিক ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন, সেটি সমসাময়িক বিশ্বসঙ্গীত ভান্ডারে খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এজন্য তাঁর গানকে আমি কখনোই আঞ্চলিক গান বলবোনা, বলবো নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় লেখা যুগশ্রেষ্ঠ গীতি-কবিতা। কেননা তাঁর গান একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সময়কে ছাড়িয়ে বহুমাত্রিকতায় পরিব্যপ্ত। তিনি গীতিকার নন, তিনি গীতিকবি। তিনি যদি তাঁর গান লেখার ভাষাটাকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে না নিয়ে প্রমিত গদ্যকে বেছে নিতেন, তাহলে এতোদিনে বিশ্ব সাহিত্যে তাঁকে নিয়ে কাড়াকাড়ি সৃষ্টি হতো।

তাঁর মধ্যে যেমন সৃষ্টির সহজাত প্রতিভা রয়েছে তেমনি রয়েছে শিক্ষার আলো। তিনি একই সাথে যেমন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স, তেমনি সঙ্গীত কলেজ থেকেও গ্র্যাজুয়েট। তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পল্লিগীতি শিল্পী আবদুল আলিম এর সবচাইতে প্রিয় ছাত্র ছিলেন, আবার সঙ্গীত কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। এ কারণে হয়তোবা তাঁর গানগুলো ব্যাকরণের মাপকাঠিতে উর্ত্তীণ্য, মহত্তম সৃষ্টি।

বাংলা সাহিত্যের সাধক বলেই হয়তোবা তাঁর গানে আমরা উপমা, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, অন্তমিলের নান্দনিক প্রকাশ দেখতে পাই। শব্দচয়ন, শব্দ বিন্যাসে রয়েছে সহজাত মুন্সীয়ানা। তাঁর গানে যেভাবে চিত্রকল্প, রসবোধ, চরিত্র সৃষ্টি, সংলাপ, ভাব বৈচিত্রের প্রকাশ ঘটেছে, বিশ্ব সঙ্গীত ভান্ডারে বিরল।

অধ্যাপক মো: হাশেম এর গানের চরিত্রগুলোর বেশীরভাই আমাদের গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আর এই মানুষগুলোকে হাশেম যেভাবে নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন, অনুধাবন করেছেন তাঁদের মনোজাগতিক ভাবনা, স্বপ্ন, ভ্রান্তি ও বৈকল্য; যা দেখে বিস্মিত হতে হয়। মো: হাশেম এর পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিলো অসাধারণ। কোনো একদিন আসবে, যেদিন দেশেরতো বটেই, বর্হিবিশ্ব থেকে মানুষ এদেশে আসবে হাশেম এর সৃষ্টির উপর গবেষণা করতে, এটি আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি।

আমরা অনেক দেরিতে তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছি। যেটি আরও অনেক আগে থেকে শুরু করা উচিত ছিলো, একই সাথে বলবো তিনি যথাযথ মূল্যায়ণ পাননি। তাঁকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের শিল্পী হিসেবে একটি নির্দিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এখনও। এবং এটাও সত্যি তাঁর সৃষ্টিকে বর্তমানে তাঁর পরিবারই শুধু ধরে রেখেছে। তাঁর অনুজ ভাই মো: কামাল উদ্দিন, বড় মেয়ে শাহনাজ হাশেম কাজল, কণিষ্ঠপুত্র রায়হান কায়সার হাশেম এর কন্ঠে বেঁচে আছে অধ্যাপক মো: হাশেম এর গান।

আমাদের দেশের লোক সঙ্গীতের সাধক লালন ফকির, হাছনরাজা, ফকির কালু শাহ, শাহ আব্দুল করিম এর মতোই মো: হাশেম একজন সাধক, অথচ অন্যদের গান যেভাবে গীত হয়েছে, চর্চা হয়েছে বা হচ্ছে সেভাবে তাঁর গান হয়নি। হয়তোবা নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান শুনেই পিছিয়ে রয়েছে, কিন্তু এর গভীরে কেউ প্রবেশ করেননি, তাই এর উৎকৃষ্টতাও অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। এজন্যে নোয়াখালীর শিল্পী সমাজের ব্যর্থতা রয়েছে বলে আমি মনে করি।

অধ্যাপক মো. হাশেম এর গান শুধু তাঁর পরিবার নয়, ছড়িয়ে দিতে হবে গোটা বিশ্বে। সে জন্যে সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে অকুন্ঠচিত্তে এগিয়ে আসতে হবে, উদ্যোগ নিতে হবে, নিরলস কাজ করতে হবে।

সংবাদটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন