শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২ | ২২শে আশ্বিন ১৪২৯

বুধ গ্রহের বুকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন

উপরের যে ছবিটি দেখছেন তা হচ্ছে বুধ গ্রহের একটি crater বা জ্বালামুখ। এর নাম কি জানেন? এর নাম হচ্ছে আবেদিন ক্রেটার (Abedin Crater)। নামটা কেমন পরিচিত লাগছে না? হ্যাঁ, নামটি দেওয়া হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নামানুসারে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন (১৯১৪-১৯৭৬) চিত্রকলার মুকুটহীন সম্রাট ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী। তিনি আমাদের অহঙ্কার। বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির অহঙ্কার।

একটু অবাক হবো এই ভেবে, জয়নুল আবেদিনের নাম বুধগ্রহের জ্বালামুখে কেন, তিনি কি বিজ্ঞান গবেষকও ছিলেন? আবার ভালো লাগবে নিজেদের নামগুলোর মহাজাগতিক ব্যবহার দেখে। পৃথিবীর মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা তার নাম বিশ্ববিজ্ঞানের নীতিনির্ধারকদের এখানে বসাতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

চল্লিশের দশকে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান লেখকদের প্রবল প্রভাব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ফলে মানবজাতি মহাকাশ যুগে পদার্পণ করে। এরই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ১৯১৯ সাল থেকে চাঁদ ও মঙ্গলগ্রহের খাদ, জ্বালামুখ, ইমপ্যাক্ট ক্রেটার কল্পবিজ্ঞান লেখকদের নামে করার একটি রীতি প্রচলন করে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন(আইএইউ)। সেই কারণে জুলভার্ন, এইচজি ওয়েলস, আলেক্সান্দার বেলায়েভসহ অনেক লেখকের নামে চাঁদ ও মঙ্গলের ক্রেটার বা জ্বালামুখের নাম রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন এই ধারাকে আরও বিস্তৃত করে। শুধু সায়েন্স ফিকশন লেখক নয়, বিজ্ঞানীদের নামে নয়, যারা মানবসভ্যতার মানবিকবোধ ও উপলব্ধিকে গভীরতর করেছে সেসব শিল্পী-সাহিত্যিকের নামেও করার একটি উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ অনুভব করে মানুষ। তাই আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, খাদগুলোর নাম করবেন বিখ্যাত শিল্পী ও সাহিত্যিকদের নামানুসারে। আইএইউর নিয়ম অনুসারে, বুধ গ্রহের নতুন আবিষ্কৃত প্রতিটি গ্রহের গর্ত ও জ্বালামুখের নাম এমন কোনো শিল্পীর নামে হতে হবে, যারা ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে পৃথিবীব্যাপী পরিচিত। নামকরণের অন্তত তিন বছর আগে মৃত।

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বুধগ্রহের একটি জ্বালামুখের নামকরণ হয়েছে প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের সম্মানে। এই স্বীকৃতিটি দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ৯ জুলাই। আবেদিন ক্রেটারের ব্যাস হচ্ছে ১১৬ কিলোমিটার। এ ছাড়া বুধের অন্যান্য জ্বালামুখ আরও যাদের নামে হয়েছে তারা হচ্ছেন লিও টলস্টয় ও পাশ্চাত্যের সংগীত স্রষ্টা, যিনি বধির ছিলেন, সেই বিঠোফেন। আন্না কারেনিনা ও ইভান ইলিচের মতো বইয়ের লেখক লিও টলস্টয়ের নামানুসারে খাদটির নাম হচ্ছে টলস্টয় বেসিন, ৫১০ কিলোমিটার ব্যাসের। পাশ্চাত্যের সংগীতজ্ঞ এবং মুনলাইট কম্পোজিশনের স্রষ্টা বিঠোফেনের নামানুসারে জ্বালামুখের নাম হচ্ছে বিঠোফেন বেসিন, ৬২৫ কিলোমিটার ব্যাসের। শুধু লেখক ও শিল্পী নয়, বিজ্ঞানে তাপের একক ক্যালরি দিয়েও নামকরণ হয়েছে। বুধের সবচেয়ে বড় জ্বালামুখের নাম হচ্ছে ক্যালরিস বেসিন, ১৫৫০ কিলোমিটার ব্যাসের।

চাঁদেরও কয়েকটি খাদের নামে জড়িয়ে আছে বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম। যেমন- Saha Crater (মেঘনাদ সাহা এর নামানুসারে), Mitra Crater (শিশিরকুমার মিত্র), Bose Crater (জগদীশ চন্দ্র বসু)।

বুধ হচ্ছে সৌরজগতের ৮টি গ্রহের প্রথম গ্রহ, যার কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। সূর্যের অতি কাছে অর্থাৎ পৃথিবীর চেয়েও অর্ধেক দূরত্বে অবস্থান করায় সৌরবায়ুর প্রবলপ্রবাহ বুধে আবহম-লের বিকাশ ঘটতে দেয়নি। তাই ধূমকেতু ও গ্রহাণুর আঘাত তাকে সহজে ক্ষতবিক্ষত করেছে। মহাকাশযান ম্যাসেঞ্জারের অভিযানের পর আমরা বুধগ্রহ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। বুধগ্রহে সৃষ্টি হয়েছে ছোট গামলাকৃতি থেকে শত কিলোমিটার বিস্তৃত অনেক জ্বালামুখ, যার একটির নাম ‘আবেদিন ক্রেটার’।

দেশ, মাটি ও মানুষের মঙ্গলার্থে আজীবন যারা রক্তঘাম ঝরান তাদের কথা যেমনি সত্যিকার দেশপ্রেমিক কখনো ভোলেন না। তেমনি দেশপ্রেমিক চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের কথাও এ দেশবাসী কখনো ভুলবে না। কারণ, তিনি আজীবন লড়াই করে রক্ত ঝরিয়েছেন এ দেশের শিল্পচর্চার প্রতিকূল পরিবেশ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মুক্তিযুদ্ধসহ সব অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে।

জয়নুল আবেদিন মাত্র ৬১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দেশ, মাটি, বাংলার প্রকৃতি, জীবনাচার, ঐশ্বর্য, দারিদ্র্য, বাঙালির স্বাধীনতার ও মানুষের মঙ্গলার্থে স্পৃহা যিনি তুলি আর ক্যানভাসে বিশ্ববাসীর সামনে মূর্ত করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে সবার আগে জয়নুল আবেদিনের নামটিই গিয়েছে। এটা পৃথিবীর মানুষের ভালোবাসা। এর মাধ্যমে মানুষরা তার প্রতি ঋণ শোধ করতে চেয়েছে। এসব পদক্ষেপই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখবে, বহু দূরর পথ পাড়ি দেবে।

সংবাদটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন