সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২১শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

একাত্তরের এই দিনে

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন //

১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে যে ঘোর অমানিশার সূচনা হয়েছিল, তার অবসান হয় আজ থেকে ৪৯ বছর আগে, ১৯৭১ সালের আজকের দিনে।

ক্ষমতালোভী ও উচ্চাভিলাষী মীর জাফর আলী খান আর তার দোসরদের বেঈমানি এ জাতির ললাটে লিখে দিয়েছিল দুই শতাধিক বছরের জন্য গোলামির জিন্দেগি। স্বাধীনতা হারিয়ে দু’শতাধিক বছর ধুঁকে ধুঁকে এ জাতিকে বুঝতে হয়েছিল স্বাধীনতার মূল্য।

প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর এ জাতির জীবনে ফিরে আসে, আর নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা নামের অমূল্য রত্ন একবার হারালে তা ফিরে পাওয়া কত কঠিন।

তবে এ জাতি পরাধীনতাকে কখনই সহজে মেনে নেয়নি। কখনও পরাধীন হলেও যখনই সুযোগ এসেছে, বিদ্রোহ করেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আঠারো শতকের শেষের দিকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা আন্দোলন এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, বিশ শতকের শুরুতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন- এ সবই এ জনগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি তাদের ধূমায়িত অসন্তোষ ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে বারবার পাদ-প্রদীপের আলোয় তুলে ধরেছে।

হয়তোবা সফলতা আসেনি; কিন্তু জনতার মননে আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রজ্বলিত রাখতে এসব আন্দোলন-সংগ্রাম ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে গেছে।

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি আদায়ে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল এখান থেকেই ১৯০৬ সালে, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে।

পরবর্তীকালে এ সংগঠন মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি জানিয়ে ১৯৪০ সালে লাহোরে যে ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে সেটাও উত্থাপন করেছিলেন এ জনপদের আরেক কৃতী সন্তান শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোয় যখন মুসলিম লীগ তেমন সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়, তখনও বাংলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।

১৯৪৬ সালের নির্বাচন, যা কিনা পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল, তাতে বাংলায় মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১২১টি আসনের মধ্যে ১১৪টিতে জিতে বিস্ময়কর সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। মোট কথা, এ তল্লাটের লড়াকু জনগোষ্ঠীর আপসহীন ভূমিকা মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সেদিনকার আন্দোলনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড পেলেও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী দ্রুত বুঝতে পারল, তাদের প্রত্যাশিত স্বাধীনতা এখনও আসেনি। জাতিগত স্বাতন্ত্র্র্য ও কৃষ্টি-কালচারের প্রতি অবজ্ঞা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিশেষ করে উচ্চাভিলাষী সমরনায়কদের হস্তক্ষেপে বারবার গণতন্ত্রের হোঁচট খাওয়ার পরিণতিতে দিনের পর দিন পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধান বাড়তে থাকে।

’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ’৬০-এর দশকে বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা আন্দোলনে তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ’৭০-এর নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল এ জনপদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত কর্মসূচির ওপর এক ধরনের রেফারেন্ডাম, যেখানে গণরায় তার পক্ষে এসেছিল। নির্বাচনের ফলাফল বলে দিচ্ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম অনানুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

তারপরও বঙ্গবন্ধু শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী জুলফিকার আলী ভুট্টোর হঠকারিতা, গণরায় মেনে নিতে অস্বীকৃতি, তার পক্ষ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সামরিক সরকার কর্তৃক ’৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে তাকে উল্টো গ্রেফতার এবং এ তল্লাটের শান্তিপ্রিয় ছাত্র-জনতার ওপর পাকবাহিনীর ক্র্যাকডাউন এতদঞ্চলের স্বাধীনতাকে অনিবার্য করে তোলে।

বঙ্গবন্ধু এ রকম আশঙ্কা থেকে তার ৭ মার্চের ভাষণে আগেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন। কাজেই দেশের মুক্তির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে এ দেশের জনগণের বেগ পেতে হয়নি।

দেশের বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্যরাও বিদ্রোহ করে দ্রুত জনতার কাতারে শামিল হন। অসংখ্য শহীদের প্রাণ ও মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শক্তিশালী পাকবাহিনীকে পরাস্ত করে অবশেষে বিজয় ছিনিয়ে আনে বাংলার দামাল ছেলেরা। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হানাদার বাহিনীকে যুদ্বের ময়দানে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে বিজয় তুলে নেয়ার এমন ঘটনা পৃথিবী এই প্রথম প্রত্যক্ষ করল।

এ এক অনন্য ইতিহাস। এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর পরাজয় অনিবার্য ছিল, কারণ তারা একটি মুক্তির স্বপ্নে বিভোর ঐক্যবদ্ধ জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। মুক্তি ও বিজয়ের আনন্দ মানুষকে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। আমরাও প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠি। কিন্তু এর পেছনে দীর্ঘ সংগ্রামের কষ্ট ও বেদনার যে গভীর ক্ষত লুকিয়ে আছে, তা কি কখনও মুছে যাবে?

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

(সূত্র: যুগান্তর)

সংবাদটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন