রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২ | ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বাংলাদেশে তৈরি প্রথম গাড়ি বাংলা কার

বাংলাদেশে তৈরি প্রথম গাড়িটি বাংলা কার নামে রাস্তায় নামতে যাচ্ছে। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলা কার্‌স লিমিটেড, যা মুলত হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। তাদের কারখানা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার অন্তর্গত পঞ্চবটিতে।

ঈদের পর জুন মাস থেকে মেড ইন বাংলাদেশ ট্যাগ সহ গাড়িটি বাজারে আসবে। অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এই সাত সিটের গাড়িটির দাম পড়বে মাত্র ৩০ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত তৈরিকৃত এই গাড়ির সংখ্যা ৩৬টি। তার মধ্যে বিক্রি হয়েছে ১৪টি। ইতোমধ্যেই সামাজিক গণযোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গাড়িটি নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলা কার-এর বৈশিষ্ট্য
চলুন, দেশীয় ব্র্যান্ডের এই গাড়িটি সম্পর্কে আরও কিছু জেনে নেয়া যাক।

– ১০০ এরও বেশি ভয়েস কমান্ডের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ভার্চুয়াল সহকারী ব্যবস্থা এবং যে কোনো স্থান চিহ্নিত করার জন্য ২৮টি স্বতন্ত্র ভয়েস কমান্ড রয়েছে

– থাকছে দেড় লিটার টার্বো ইঞ্জিন এবং ট্রিপটোনিক মুড পাওয়ার প্যাক স্বয়ংক্রিয় থেকে ম্যানুয়াল এবং ম্যানুয়েল থেকে স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সমিশনে খুব সহজে পরিবর্তন করার জন্য

– নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের পাশাপাশি বোল্ড স্পোর্টি লুক

– সুরক্ষার নিমিত্তে আপনার যাত্রা রেকর্ড করার জন্য আধুনিক এলইডি পার্কিং লাইট, ফগ ল্যাম্প এবং ইনফিনিট স্টারলাইট গ্রিল ডিভিআর ক্যামেরাসহ হেডলাইট

– সেরা লেদার এবং প্রাইম গ্রেড উপকরণ দিয়ে সজ্জিত আভ্যন্তরীণ সজ্জা

– মাল্টিমিডিয়া কনসোল নিয়ন্ত্রক দ্বারা চালিত বিনোদনের বৃহৎ এবং বর্ধিত ইন্টারফেসের জন্য ৯ ইঞ্চির ইনফোটেইনমেন্ট ডিসপ্লে

– ব্লুটুথ সংযোগ- সহজ সংযোগের জন্য ইউএসবি এবং সহায়ক আর্মরেস্ট

– জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ সহ স্বয়ংক্রিয় এসি

– পর্যাপ্ত লেগরুমসহ ৭টি সিট

– ড্যাশবোর্ডের স্টিয়ারিং হুইলে রাখা চারটি এয়ারব্যাগ এবং হাঁটুর সুরক্ষার জন্য লো-মাউন্ট

– আনন্দদায়ক শব্দ অভিজ্ঞতার জন্য একাধিক স্পিকার সমৃদ্ধ অডিও সিস্টেম

– পাওয়ার আউটপুট এবং দক্ষতার উন্নতির জন্য নতুন জেনারেশনের ৬ স্পিড সিভিটি গিয়ারবক্স

– টায়ারের চাপের উপর নজর রাখার জন্য টায়ার প্রেসার মনিটরিং সিস্টেম

– চলন্ত অবস্থায় স্মার্ট টায়ার সেন্সরগুলির সাথে ডাইনামিক ৩৬০ ডিগ্রি পার্কিং ক্যামেরা ঝামেলা মুক্তভাবে গাড়িকে পার্ক করে

– আঁকাবাঁকা/ভাঙা রাস্তায় স্থিতিশীলতার সাথে তীক্ষ্ণ বাঁক নেয়ার শক্তি দেয়ার জন্য ট্র্যাকশন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

– ডিজিটাল এবং অ্যানালগ স্পিডোমিটার ক্রুজ নিয়ন্ত্রণ

– বিল্ট-ইন ন্যাভিগেশন সিস্টেম

– ট্রাঙ্কে সুবিধাজনক অ্যাক্সেসের জন্য গাড়ীর ভিতরে এবং বাইরে উভয় দিক থেকে বোতামের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় পাওয়ার ট্রাঙ্ক খোলার ব্যবস্থা

– রেড ক্যালিপার্সের সাথে ১৮ ইঞ্চি অ্যালয় রিম্স যা আপনাকে বোতাম টিপে অথবা আপনার ভার্চুয়াল সহকারীকে ভয়েস কমান্ড দিয়ে শক্ত গ্রিপের সাথে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ক্ষমতা দেয়

– সামনের এবং পিছনের উভয় সিট থেকে আবহাওয়া উপভোগ করার জন্য ২ স্তরের প্যানোরামিক সানরুফ

– পাঁচ বছরের ওয়্যারেন্টি এবং গ্যারান্টি

বাংলা কার এবং বাংলাদেশে গাড়ি শিল্প
সাধারণত, মা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ডিএফএসকে-এর গ্লোরি আই অটো সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, বাংলা কার্‌স লিমিটেড ডিএফএসকে-এর অনুমোদিত অ্যাসেম্‌ব্লার। বাংলা কার এবং ডিএফএসকে-র মধ্যে চুক্তিটি ছিল দেড় বছরের। করোনাভাইরাস প্রভাবের কারণে তাদের মধ্যকার কার্যকলাপ আর সামনের দিকে এগোয় নি।

কিন্তু বাংলা কার্‌স লিমিটেড চীন, ভারত, জাপান এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশ্বব্যাপী নামী-দামী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ দেশে এনে গাড়ি তৈরি করে আসছে। গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য জাপানের ইসুজু, চীন থেকে বডিপার্টস এবং ইন্দোনেশিয়ার চ্যাসিস নিয়ে তারা গাড়ি তৈরি করছে।

যেখানে হাভাল কোম্পানির গাড়িগুলো আসে সরাসরি চীন থেকে, টয়োটা গাড়িগুলো আমদানি হয় জাপান থেকে, সেখানে বাংলা কার তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ বাংলাদেশে।

পিএইচপি বানাচ্ছে ফোটনের গাড়ি, প্রগতি তৈরি করছে মিতসুবিশির গাড়ি, আর বাংলা কার্‌স লিমিটেড তৈরি করছে বাংলাদেশেরই গাড়ি। কিন্তু ফোটন বা মিতসুবিশির মত দুয়েকটা মডেল নয়, তারা যে কোনো মডেলের গাড়িই তৈরি করতে সক্ষম।

গাড়িটির বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হলেও আনুষ্ঠানিক যাত্রা এখনও শুরু হয়নি। গত ২৬ মার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চলমান মহামারী পরিস্থিতির কারণে সেটা ঈদের পরে পিছিয়ে যায়। এই জুন থেকে, বাংলা কার বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করবে পিকআপ দিয়ে।

ইতোমধ্যে ১৮১-১৮২ তেজগাঁওয়ের ঠিকানায় তাদের একটি শোরুম আছে। তারা সেখানে ৮টি ভিন্ন রঙের গাড়ি প্রদর্শন করছে। এগুলো হলো- রেড ওয়াইন, ইলেকট্রিক ব্লু, মিড-নাইট ব্লু, বাদামী, সাদা, সিলভার, লাল এবং কালো। এগুলো ছাড়াও তারা ক্লায়েন্টদের প্রয়োজন মত অন-ডিমান্ড রঙের গাড়ি দিতে প্রস্তুত। ২০২১ সালের নতুন মডেলের গাড়ি ইতোমধ্যে শোরুমটিতে তোলা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এই জাতীয় একটি এসইউভি (স্পোর্টি ইউটিলিটি ভেহিকল) এর জন্য ১ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়, সেখানে এটি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ লক্ষ টাকায়। কিন্তু করোনা মহামারীর কথা বিবেচনায় আনা হলে, বর্তমানে কমতে থাকা আয়ের মানুষদের পক্ষে ঐ দামে গাড়ি কেনার ব্যাপারটা কতটুকু অনুকূল হবে তা বলাই বাহুল্য। ইতোমধ্যে গাড়ি ক্রেতাদের মাঝে যে গুঞ্জন উঠে আসছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, দেশীয় গাড়িকে ক্রয়যোগ্য করে তুলতে হলে আরো বেশী বাজেট বান্ধব হওয়া জরুরী।

বাংলা কার-এর ভবিষ্যত
বাংলা কার-এর সামনের দিনগুলো নিয়ে হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জাকির হোসেন খুবই আশাবাদী। ঈদের পর বাংলা কার্‌স লিমিটেড তাদের নিজস্ব ডিজাইন দিয়ে গাড়ি তৈরি করবে। নারায়ণগঞ্জের কারখানা থেকে তৈরি করা হবে ১২ ধরণের গাড়ি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক, লরি, পিকআপ ইত্যাদি।

প্রথম পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের প্রত্যেকটিতে শোরুম চালু হবে। তদুপরি, গাড়ি নির্মাতা সংস্থা সারা দেশে আরও ৩০ টি শোরুম চালু করতে যাচ্ছে।

প্রতিটি গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে, উৎপাদন সংক্রান্ত সমস্ত কার্য সম্পাদিত হবে ঘরোয়া ব্র্যান্ড এবং ডিজাইনের কথা মাথায় রেখে। অতঃপর, বাংলা কার্‌স লিমিটেড গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ১৫০০ থেকে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে। সবকিছু যদি পরিকল্পনা মাফিক চলে, তবে তারা আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে গাড়ি রপ্তানি করতে সক্ষম হবে। এমনকি টয়োটার মতো দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি করার ব্যাপারেও তারা যথেষ্ঠ আশাবাদী।

এখন গাড়িগুলোর পরীক্ষামূলকভাবে প্রোডাকশন চলছে। জুন-জুলাইয়ের পর বাণিজ্যিকভাবে আরও গাড়ি নামাতে পারবেন বলে তারা বিঃশ্বাস করেন। এভাবে তারা বাংলাদেশের তৈরি গাড়িগুলোকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হবে।

উপরন্তু, পরের বছর তারা চালু করতে চলেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। সেই সূত্রে, বিশ্ব জুড়ে অটোমোবাইল শিল্পে বাংলাদেশের নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হবে।

বাংলা কার ব্যবহারকারীরা গাড়ি সংক্রান্ত সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাবেন বাংলাদেশ থেকেই। গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ হাজার গাড়ি বাজারজাত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এভাবে নিশ্চিতভাবেই বৈদ্যুতিক যানবাহন সহ তারা সব ধরণের যানবাহনকে রাস্তায় নামাতে পারবে। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বাংলা কার-এর তাৎপর্যপূর্ণ অবদান থাকবে।

এখন শুধু দেখার বিষয় যে, বাংলা কার কতটুকু পরিবেশ বান্ধব হবে! তাছাড়া ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকা মহামারী অবস্থায় ভবিষ্যতে গাড়িটি ক্রেতাদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে!

শেষ কথা
পোশাক শিল্পের মতো বাংলাদেশে তৈরি বাংলা কার একটি বড় অর্জন হতে চলেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশিরা সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হবে। আর, গাড়িটিতে সমস্ত হাই টেক সেবা থাকায় এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্পে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত হবে। অতঃপর জনসাধারণের আর্থিক উত্তরণে বাংলা কার নিঃসন্দেহে একটি সফল বাজার পেতে পারে।

সংবাদটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন