রবিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২ | ৯ই মাঘ ১৪২৮

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও সাংবাদিকতা

মুস্তফা মনওয়ার সুজন: 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শখের বসে সাংবাদিকতায় শুরু করলেও এক পর্যায়ে পুরোপুরি জড়িয়ে যায়। ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতার শুরুতে যখনই কেউ টের পায়, সে তার সহপাঠীদের চেয়ে একটু আলাদা; শিক্ষক, সিনিয়র-জুনিয়র, ছাত্রসংগঠনের নেতা, ক্যাডার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমনকি আশপাশের থানা পুলিশও তাকে সমীহ করছে; তখন নিজের অজান্তেই ভেতরে এক ভিন্ন ধারার সুখ বয়ে যায়। অতো কম বয়সে ওই অনুভূতি অগ্রাহ্য করা কঠিন। তাই ওই সুখানুভূতি নেশায় পরিণত হয়। এখন মনে হয়, জগতের সব আনন্দ অনুভূতিই এক ধরনের নেশার সৃষ্টি করে। এভাবেই রসায়ন, অংক বা পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও সাংবাদিকতার আসক্তিতে কেউ কেউ বুদ হয়ে ওঠে। এতে সংকট অনেক। ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদের হুমকি-ধামকি, মারধর; এমনকি ডিগ্রি না পাওয়ার শঙ্কাও দেখা দেয়।তবুও যেনো কিছুই করার নেই! ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখতেই শিহরণ জাগে। সুতরাং, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা ছাত্র জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুখের অনুভূতি। অনেকে খণ্ডকালীন চাকরি-এটা-সেটা বলে; কিন্তু আমি বলি, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা বিশাল ক্যানভাসে এক লংকাকাণ্ড। কারণ এর অনুভব বহুমাত্রিক এবং অসীম।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা শুরু হয় শূণ্য থেকে। এক কিশোরের লেখা খবর নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়ায়। ওই খবর পড়ছেন তার বাবা-মা, বন্ধু, শিক্ষক; উড়ে বেড়ানো মেঘ বালিকাটিও পড়ছে মুগ্ধতায়। কী এক ক্ষমতা পেয়ে কিশোর নিজেকে আবিস্কার করে নিজের ল্যাবরেটরিতে। এখানে নিজেই পরীক্ষক, নিজেই শিক্ষার্থী, নিজেই উপকরণ। চলতে থাকে জটিল ক্রিয়া-বিক্রিয়া। ছাত্রজীবনে সাংবাদিকতা করে সাংবাদিক হয়ে ওঠা যায় কি-না বলা মুশকিল, তবে পেশা জীবনে ২৪ ঘণ্টার সাংবাদকর্মী হওয়ার বীজটা বপন হয় তখনই। ক্যাম্পাসেই দিনরাত খবর তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জেগে থাকে ২৪ ঘণ্টা। সজীব ক্যাম্পাসই ২৪ ঘণ্টার সংবাদকর্মী তোলে। তবে শর্ত আছে, বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে নিরঙ্কুশ স্বায়ত্তশাসিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিলেন। একই অধ্যাদেশের অধীনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেদের মতো করে নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট ও সিনেটের। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট নেই সেখানে সিন্ডিকেট সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি প্রণয়নের এই সর্বোচ্চ বডিগুলোতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব থাকে। উচ্চশিক্ষার এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও যুগোপযোগী করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বায়ত্তশাসন প্রদানে ধরে নেয়া হয়েছিল, উচ্চশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা বিবেক দ্বারা পরিচালিত হবেন। বাস্তবেও তাই হওয়া উচিত।

৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম পেয়েছে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা। এই অধ্যাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম উপহার বলা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট জাতীয় সংসদের সঙ্গে তুলনীয়। উপাচার্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হলেন স্বায়ত্তশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলো মন্ত্রিসভার অনুরূপ। এছাড়া রয়েছে একাডেমিক কাউন্সিল, অনুষদ, বিভাগ ইত্যাদি। এর প্রতিটির একটি চমৎকার গণতান্ত্রিক চরিত্র বহমান। এ যেনো রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটা রাষ্ট্র। সংবিধানই এ ক্ষমতা দিয়েছে রাষ্ট্রের স্বার্থেই।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে কাঠামো, তার চেয়ে অনেক দিক দিয়েই সমৃদ্ধ ’৭৩-এর অধ্যাদেশ। এর প্রতিটি অংশ যদি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা যায়, তাহলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানী-গুণী ও আগামী দিনে জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা হয়ে ওঠে। আর যদি অধ্যাদেশ অনুসরণ না করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। বরং তা জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ এ মুহূর্তে জরুরি।

ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক যুগে গির্জার পোপরা ক্রমাগত ক্ষমতা দখল করতে থাকে, ঠিক সে সময় বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সৃষ্টি হতে থাকে। অক্সফোর্ড (১১৬৭), কেমব্রিজ (১২৩৯), নেপলস (১২২৪) ইত্যাদি। অক্সফোর্ড প্রথম থেকেই সমাজকর্তা ও বহিরাগত হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সচেতন ছিল। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে চাইলে তারা কঠোর প্রতিবাদ করতো, এমনকি সংঘর্ষও হতো। পরে রাজা তৃতীয় হেনরি (১২১৬-১২৭২) রাজ্য পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেন যে, কোনভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না।

বহু বছরের পর্যবেক্ষণের পরিসংখ্যান হলো, স্বৈরাচার এবং দুষিত গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বন্দ্ব চিরায়ত। বাংলাদেশেও এ তত্ব পরীক্ষিত; ১৯৫২তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্যায়কে মেনে নেয়নি, ১৯৭১ সালেও মেনে নেয়নি, ১৯৯০তেও স্বৈরশাসককে মেনে নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় যদি শাসকদের করায়ত্ব হয়ে যায় তবে তা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞায় থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বিপন্ন হলে একাডেমিক কার্যক্রমসহ সবই রসাতলে চলে যায়। বিপন্ন স্বায়ত্তশাসনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিসহ পুরো প্রশাসন রাষ্ট্রযন্ত্রের তাবেদার হয়ে নিজেও স্বৈরাচারী হতে হয়ে পড়ে বাধাহীন, ভেঙে পড়ে শৃঙ্খলা। শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্র ভর্তিতে শুরু হয়ে যায় লাগামহীন দুর্নীতি। কথায় কথায় সর্বনাশা বহিস্কার খেলা। শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি হয়ে ওঠে বেপরোয়া। ক্যাম্পাসে বাড়তে থাকে অরাজকতা, সংঘাত, এমকি হত্যাকাণ্ড। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা হয়ে ওঠে জটিল। শুদ্ধ সাংবাদিকতা দূরের কথা হামলা, মামলা, তদন্ত কমিটি আর বহিস্কার ঠেকাতেই গলদঘর্ম হতে হয়।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই উদাহরণ দেয়া যায়। ২০০২ সালের কথা। দৈনিক যুগান্তরে খবর প্রকাশের জের ধরে তৎকালীন বিএনপি জোট সরকারের শরিক একটি ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারা ক্যাম্পাসে আমার ওপর প্রকাশ্যে হামলা করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানলো, শুনলো, তদন্ত কমিটি হলো; কিন্তু ফল পেলাম না। পরে সিলেটের সাংবাদিক নেতাদের হস্তক্ষেপে ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধিরা পার পেয়ে গেলো।

স্বায়ত্তশাসনহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কুপমণ্ডুকতা ও বিচারহীনতার কদর্য ও ভয়ঙ্কর উদাহরণ আরো আছে। ক্যাম্পাসের চলচ্চিত্র সংসদ ‘চোখ ফিল্ম সোসাইটি’র সভাপতি থাকাকালে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা প্রদর্শনীর অয়োজন করা হলো। ক্যাম্পাসে প্রদর্শনীর অনুমিত চাইতে গেলে তৎকালীন প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যরা সিনেমাগুলোর সিডি জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, এসব ক্যাম্পাসে দেখানো যাবে কি-না তা আগে দেখতে হবে, তারপর অনুমতি। বিস্ময়ের অন্ত রইলো না। এ ঘটনায় দুনিয়ায় হৈ চৈ পড়ে গেলো। বিবিসি চলে এলো; সংগঠনের সভাপতি হিসেবে আমার সাক্ষাতকার নিলো; ভারতীয় দূতাবাস নড়েচড়ে উঠলো। সমালোচনার ঝড়ের মুখে অনুমতি মিললো। তখনকার সব পেপার কাটিং সংরক্ষিত আছে।

এমন অস্থির সময়ের মধ্যেই আমাদের লেখালেখি চলতো। বৈরি পরিবেশের মধ্যেই ক্যাম্পাসে সাংবাদিক সহকর্মি বন্ধুদের মাঝে ঐক্য থাকতো পাথরের মতো। ক্যাম্পাস প্রেসক্লাব পালন করতো শক্ত ভূমিকা। সিলেট ব্যুরোসহ পত্রিকার ঢাকা অফিস বিপদে পাশে দাঁড়াতো হিমালয়ের মতো। রক্ষা করতো। তখন এতোসব ঢাল রেখেই সাংবাদিকতা করতে হতো। দিন হয়তো বদলেছে। তবে শাসকদের মানসিকতা কতটা ইতিবাচক হয়েছে তার জবাব সমসাময়িক পরিস্থিতিই বলবে।
স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে অঙ্গীকার রাষ্ট্র করেছে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা অবারিত থাকা অনিবার্য। অন্যথায় রাষ্ট্রকে দীর্ঘ মেয়াদে চড়া মূল্য দিতে হবে। দেশ হয়ে পড়বে শিক্ষাবিদহীন, বিজ্ঞানীহীন, রাজনীতিবিদহীন, সাংবাদিকহীন। তাহলে থাকলোটা কি! ঝাঁকে ঝাঁকে অথর্বদের নিয়ে রাষ্ট্র হয়ে পড়বে অর্থহীন।

লেখক: সাংবাদিক ও শাবি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি।

সংবাদটি আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন